কল রেকর্ড ফাঁসের তদন্ত হয় না

editoreditor
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  10:10 AM, 05 July 2021

 

দায় নিতে চান না কেউ, উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা
আইনটি কেন সংবিধানবিরোধী নয়- হাইকোর্টের রুল জারি
১৫ বছরেও রুলের জবাব দেয়নি রাষ্ট্রপক্ষ, অগ্রগতি নেই রিটেরও
গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়মুক্তি দেয়ায় অপব্যবহার বেড়েছে -মত বিশেষজ্ঞদের
আইনি ত্রুটিতে নেই শাস্তির নজির
রেকর্ড ফাঁসের প্রবণতা বেড়েছে। বেড়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ব্যক্তির গোপনীয় আলাপচারিতা ফাঁস হচ্ছে। ফাঁস হওয়ার পরই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রচার করা হচ্ছে টেলিভিশনেও। এমন ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটছে। তবে ফাঁস হওয়া রেকর্ডের দায় নিচ্ছে না কেউ। কে বা কারা রেকর্ড ফাঁস করছে তারও হদিস মিলছে না। ফলে আইনি পদক্ষেপও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পরও জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এমনকি বেআইনি রেকর্ড ফাঁসের তদন্তও হয় না। বিচার হয়েছে এমন নজিরও নেই। উল্টো প্রচারিত তথ্যের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মামলা সাজানোর ঘটনা ঘটেছে অহরহ। তাই আড়িপাতা এড়াতে অনেকেই বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন অ্যাপে ভরসা রাখছে। বিপত্তি ঘটছে সেখানেও। বিদেশি অ্যাপ ব্যবহারের ফলে তথ্য চুরির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

এদিকে বৈধ যোগাযোগের গোপনীয়তা সংরক্ষণ সংবিধানবলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও অহরহ ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। গত জুনে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির একটি লিগ্যাল নোটিসও পাঠান। নোটিসে বলা হয়, সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে ফ্রি-স্টাইলে ফোনালাপ রেকর্ড ও ফাঁসের এই বেআইনি কাজ বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ কী? তবে আগেও আড়িপাতা রোধে প্রতিকার চেয়ে একাধিকবার লিগ্যাল নোটিস পাঠালেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব মেলেনি। জানা গেছে, ব্যক্তিগত ফোনে আড়িপাতা ও রেকর্ড ফাঁস করা নিষিদ্ধই ছিলো। ছিলো কঠোর শাস্তির বিধানও। তবে ২০০৬ সালে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন ঘটে। এতে ২০০১ সালের টেলিকমিউনিকেশন আইনকে সংশোধন করে নাগরিকদের টেলিফোন রেকর্ড করার অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয় সরকারকে। এ কাজে টেলিযোগাযোগ সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সহায়তা না করলে ৯৭ গ ধারায় তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে ওই বছরই ২০০৬ সালে এ বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদারতে রিট আবেদন করা হয়। আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনটি কেন বেআইনি ও সংবিধানবিরোধী নয়, তা ব্যাখ্যা করতে রুলও জারি করে। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই রুলের জবাব দেয়নি। জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকে। আজ পর্যন্ত এই মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সংশোধিত ওই আইন কার্যকরের জন্য ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি।

২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট রাষ্ট্র বনাম অলি মামলায় হাইকোর্টের একটি রায়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটি ও টেলিফোন কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব রয়েছে এ সংক্রান্ত নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার মেনে চলার এবং তারা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন মোতাবেক ছাড়া তাদের গ্রাহকের কোনো তথ্য কাউকে দিতে পারে না। তবে আদালতের রায়ের পরও সম্প্রতি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির রেকর্ড ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। গেল মাসে সেনাবাহিনী ও র‌্যাব নিয়ে স্পর্শকাতর মন্তব্য করা ফোনালাপ ফাঁসের অভিযোগে পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা ও পুলিশের একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২৬ মে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়। তারা হলেন— সমপ্রতি এসপি পদে পদোন্নতি পাওয়া র?্যাব-৫ এর এস এম ফজলুল হক এবং রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার নাজমুল হাসান। গত এক যুগে ফোনালাপ ফাঁসের বড় ঘটনা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ফোনালাপ ফাঁস। তবে সেই ফোনালাপ কারা ফাঁস করেছে সেটি তদন্তের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও দেখা যায়নি। বরং গত নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের একাধিক নেতার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ কয়েকটি টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে।

এমন অবস্থায় আইনজ্ঞরা বলছেন, রেকর্ড ফাঁসে গোয়েন্দা সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা তাদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। এখন তাদের কেউ যদি অপব্যবহার করে তাহলে কী হবে এটা কোথাও বলা নেই। এই জায়গাটায় আইনের একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর আইনের এই ধারাটি তাদের জন্য বড় একটি রক্ষাকবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোনে আড়িপাতা এবং ফোনালাপ প্রকাশ নিয়ে আইনে সুস্পষ্ট কিছু আইনে উল্লেখ নেই। আর এখন পর্যন্ত ফোনালাপ ফাঁসের সাথে জড়িত কারোর সাজা হয়েছে এমন কোনো নজিরও নেই। সুতরাং এই আইন করেও কোনো ফায়দা হয়নি। তাদের দাবি, কল রেকর্ড ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধের টেলিকমিউনিকেশন আইন-২০১০ সংশোধোনিতে যে সাজার কথা উল্লেখ রয়েছে সেটা নামমাত্র। এ আইনে সাজা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিলো। কেউ যদি মনে করেন এ ধরনের ঘটনার জন্য তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে সেক্ষেত্রে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আড়িপাতার মাধ্যমে অন্যের টেলিফোন কথোপকথন রেকর্ড করার অধিকার সংশ্লিষ্ট সংস্থা ছাড়া অন্য কারো সুযোগ নেই। তাই এর উৎস খুঁজে বের করতে সরকারেরই ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। আইনজীবীরা বলেছেন, রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর তদন্ত হওয়া উচিত যে কোন উৎস থেকে সেটা ফাঁস করা হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি তদন্ত হয়েছে এমন নজির নেই। শাস্তিতো পরের বিষয়। কিন্তু উল্টো যাদের রেকর্ড ফাঁস হয়েছে তাদের নামে একাধিক মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছে। যার ফলে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। এদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরটা জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী তারা ভয়েস কল রেকর্ড রাখতে পারে না, শুধু কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) রাখতে পারে। সিডিআর হচ্ছে কোনো গ্রাহক কার কাছে কী কল করেছে বা তাকে কে কল দিয়েছে, তার রেকর্ড। ফোর-জি নীতিমালা অনুযায়ী এই রেকর্ড অপারেটরদের কাছে দুই বছরের জন্য সংরক্ষিত থাকে। আবার যে কেউ চাইলেই এ সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে না আইন অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা এই সিডিআর সংগ্রহ করতে পারে। ওই তালিকার বাইরে কেউ সিডিআর সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে না। ভয়েস কল রেকর্ড মোবাইল ফোন অপারেটররা না রাখলেও সরকারি কোনো কোনো সংস্থা ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখে এবং মোবাইল ব্যবহারকারী কোন এলাকায় রয়েছে বা তার গতিবিধিও তারা শনাক্ত করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী আড়িপাতাটা অপরাধ। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৭১ ধারায় আড়িপাতার শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির ফোনে আড়ি পাতে তাহলে শাস্তি হবে। গোয়েন্দা সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা তাদের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। এখন তাদের কেউ যদি অপব্যবহার করে তাহলে কী হবে এটা কোথাও বলা নাই। আমি মনে করি, এই জায়গাটায় আইনের একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর আইনের এই ধারাটি তাদের জন্য বড় একটি রক্ষাকবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ডেটা প্রটেকশন আইন’ থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য কোনো আইন নেই। সরকারের উচিত, একটা ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট করা। ফোনে আড়িপাতার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান থাকলেও সেখানেও রয়েছে ফাঁক।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান আমার সংবাদকে বলেন, কারো ফোনে আড়িপাতা সংবিধানের লঙ্ঘন। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদানের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি হবে। আর এ ধরনের অপরাধের জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়ে প্রতিকার পাওয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়াও আইনের মাধ্যমে আড়িপাতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আড়িপাতা আইন ও সাজা : বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন আইন-২০০১ এ টেলিফোনে আড়িপাতার দণ্ড সংক্রান্ত ৭১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি অপর দুজন ব্যক্তির টেলিফোন আলাপে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ি পাতেন তাহলে প্রথমোক্ত ব্যক্তির এই কাজ হবে একটি অপরাধ এবং তার জন্য তিনি অনধিক ছয় মাস কারাদণ্ডে বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

২০০৬ সালে এ ধারায় সংশোধনী এনে এর সঙ্গে অপর একটি প্যারা জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ৯৭(ক)-এর অধীন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্ত সংস্থার মতো সরকারি সংস্থাগুলোকে এই আইনের বাইরে রাখা হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে আবার সেই আইনটি সংশোধন করা হয়। এ আইনে ফোনে আড়িপাতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে। তবে, কোনো ব্যক্তির কথোপকথন আড়ি পেতে রেকর্ড করলে বা প্রচার করলে দুই বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো তদন্তের স্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কোনো নাগরিকের ফোনে আড়িপাততে চাইলে কি তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে?

এদিকে সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকিবে। সংবিধানের এ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে, শুধু মোবাইল ফোনই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যোগাযোগের গোপনীয়তা সংরক্ষণও করা হয়েছে।’

আপনার মতামত লিখুন :